শেখ শরীফ
শেখ শরীফ, অ্যাকাডেমিক নাম মো. শরিফুল ইসলাম। পেশায় শিক্ষক, নেশায় পাঠক ও লেখক। তাঁর কাছে জীবন মানে শেখা এবং প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখা। সাহিত্য তাঁর আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, আর একাকিত্ব তাঁর ভাবনার ক্ষেত্র। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ওমর আলীর কবিতা এবং একাকিত্বের শিল্প (২০২৩)।
শেখ শরীফ

আনছার বাজির হাট বয়ান

বার পড়া হয়েছে
শেয়ার :

গেল মাসে পাট বিক্রি করে আনছার বাজি যেকটা টাকা পেয়েছিল, সেখান থেকে কিছু রেখে সে বাজারে যায়। বাজি গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত কোন সময়েই হাটে যাওয়া বন্ধ রাখে না। কারণ, বাজারে গিয়ে মানুষের সাথে গল্প না করলে তার ভালো লাগে না। আসলে ভালো লাগে না বললে ভুল হবে বরং বাজারে সবার আগে গিয়ে সবার শেষে বাজার থেকে ফেরা তার নিত্য দিনের অভ্যাস। রাস্তার মোড়ে যার সাথে দেখা হয় তার সাথেই আগ বাড়িয়ে কথা বলা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অবশ্য বাড়ির বউ-ঝিদের প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই প্রায়ই তাকে বাজার থেকে আনতে হয়। একাজে বাজির মতো বিশ্বাসী লোক পাওয়া কঠিন। আবার যারা তার চেয়েও বয়সে বড়ো,  বাজি তাঁদের বিড়ি, তামাক পাতা, ঔষধ সেগুলোও বাজার থেকে এনে দেয়।

বাজারের প্রবেশ মুখে বাবুর তেকানির মোড়ে বাদশা মিয়ার চায়ের দোকান। বাজি, বাজারে আসলেই বাদশা মিয়ার চায়ের দোকানে এমনিতেই বসে থাকে। ছোটবেলায় তার বাপের সাথে এ দোকানেই বসতো বাজি। তখন থেকেই বাদশা মিয়া তাকে আলাদা করে স্নেহ করেন। যদিও বাদশা মিয়া আগের মতো চলাফেরা করতে পারেন না কিন্তু এখনো ক্যাশ ভালোভাবেই সামলায়। মাঝেমধ্যেই বাদশা মিয়া তার বাপ দুলা শেখের প্রসঙ্গ তোলেন। কেমন বন্ধুত্ব ছিল তাঁর সাথে সে বিষয়ে কথা বলেন। কখনো স্মৃতিতে হারিয়ে যায় বাদশা মিয়া। ফলে বাজি এ দোকানে বসে তাঁর বাপের স্মৃতি খুঁজে পায়। চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ এমনি বসে থাকার পর বাদশা মিয়া হয়তো কখনো তার ছেলে নিরুকে বলে ‘এ নিরু বাজিকে এক কাপ দুধ চা দে। সাথে একটা টোস্ট বিস্কুট দিস।’ এই বলেই বাদশা মিয়া ক্যাশের দিকে মনোযোগ দেন। নিরু বাজিকে এক কাপ দুধ চা দেয়। সাথে একটা টোস্ট বিস্কুট দেয়। বাজি বাদশা মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে, চাচা, কি দরকার আছিল? এই কথা বলেই উসখুস করতে করতে করতে দুই হাতের তালু মতলামতলি করতে থাকে। সেইসাথে বাজি পায়ের বৃদ্ধ আঙ্গুল দিয়ে ছেঁড়া জুতোর তলা ঘসতে থাকে। বাদশা মিয়া শুধু বলে– ‘খা তো বাহা।’ এবার বাজি চায়ের কাপের দিকে হাত বাড়িয়ে কাপটা তার নিজের দিকে টেনে নিতে গিয়ে এক-দুই ফোঁটা চা তার হাতের ওপরে ফেলে দেয়। বাজি তাড়াতাড়ি তার ছ্যাঁকা খাওয়া হাতটি ঠোঁটে জড়িয়ে রাখে। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়তে থাকে। অল্পক্ষণ পরে, বাজি মুখ থেকে হাত নামিয়ে পিরিচ থেকে টোস্ট বিস্কুট নিয়ে চায়ের পেয়ালায় খানিকটা চুবিয়ে চোখ বন্ধ করে মুখের মধ্যে চালান করে দেয়। হাতে ধরা টোস্ট বিস্কুটের শেষ অংশটি চায়ের মধ্যে না চুবিয়ে কুড়মুড় করে চিবুতে থাকে। বিস্কুট শেষ করে আনছার বাজি ডান হাতের তর্জনী চায়ের পেয়ালায় ঢুকিয়ে বিস্কুটের গুঁড়াগুলো তুলে এনে জিহ্বার ডগায় দেয়। তারপর, প্লাস্টিকের গ্লাস থেকে পানি ঢেলে নিয়ে ঢকঢক করে পানি খায়। এরপর, বাদশা মিয়াকে চায়ের দাম দিতে গেলেও বাদশা মিয়া দাম না নিয়ে তাকে বলে আরেক দিন দিস তো। দোকান থেকে বের হয়ে বাজি তেকানির বড়ো বটগাছের নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হাশেমের বাপের সাথে গল্প করে বাজারের দিকে রওনা হয়। তেকানি থেকে উত্তরে কিছুক্ষণ গেলেই দুধকুমার নদীর উপর ছোট ব্রিজ। ব্রিজের দুপাশে দাঁড়িয়ে তিন-চারজন জেলে মুঠজাল দিয়ে মাছ ধরছে। নদীতে তেমন স্রোত নেই। ব্রিজের নিচ দিয়ে স্বচ্ছ পানির মধ্যে পুঁটি কিংবা টেংরা মাছের মাথা দেখতে পেলেই অথবা পানি সামান্য নড়ে উঠলেই জেলেরা মুঠজাল ফিকে মারে। কারো কারো জালে ভাগ্য ভালো হলে পুকুর থেকে ভেসে আসা বোয়াল কিংবা কার্প জাতীয় মাছ জালে ওঠে। কখনো আবার তাদের হতাশ হতে হয়। কেননা, জালে মাছ না উঠে কাঁকড়া কিংবা সাপের বাচ্চা ধরা পড়ে। ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে লোকজন মাছধরা দেখে। বাজিও মাছধরা দেখার জন্য ব্রিজের এক পাশে দাঁড়ায়। নিশ্চিন্তে মাছ ধরা দেখতে থাকে।

সূর্য পশ্চিম আকাশে লাল আবির ছড়িয়ে অস্ত যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। ডানা মেলা গাঙচিল, বক, চিল মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে তাদের নিজস্ব গন্তব্যে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসে। বাজি দাঁড়িয়ে কান পেতে আযান শোনে। এমনিভাবে, বাজি কতক্ষণ একটানা দাঁড়িয়ে থাকে বুঝতে পারে না। অবশেষে, বাজি বাজারের মধ্যে প্রবেশ করে। কিন্তু, প্রথমে কী কিনবে তা ঠিক করতে না পেরে বাজি পান সুপারি কেনার জন্য মহব্বত ব্যাপারীর পাশে গিয়ে বসে। এমনভাবে বসে যেন তার পিছন ভাগ মাটির সাথে ঘষা খায়। এরপর মহব্বত ব্যাপারীকে জিজ্ঞেস করে, ভাই মজাটার গা কত?

–পাঁচ ট্যাকা।

–কাঁচাটার গা?

–সাত  ট্যাকা।

–কম কত কাঁচাটা?

–লাভ নাই ত্যামোন। সাত ট্যাকাই দাম।

–অ্যানা কম নেও।

 –কম হবা নয়।

–আচ্চা, দুটে দ্যাও।

–খালি, দুটে?

–হু।

–কোনটা?

–মজাটা অ্যাকটা, কাঁচাটা অ্যাকটা।

–এক ট্যাকা বিশ পাই হয়। আচ্ছা এক ট্যাকা দশ পাই দ্যাও।

–এক ট্যাকা নিলে হয় না।

–না, দশ পাই-ই লাভ।

–এই যে এক ট্যাকা।

–আরো দশ পাই।

–আর নাই।

–দশ আনাই লাভ।

–আর নাই। আরেকদিন দেম হেনে।

–আচ্ছা।

আনছার বাজি তার কাপড়ের ব্যাগের মধ্যে সুপারি নিয়ে পান হাটি থেকে এক টাকায় দশটা পান কিনে কাঁচা সবজির দোকানের দিকে এগিয়ে যায়। তারপর কম দামে কিছু পাকার মতো কেজি খানেক পটল-করলা, পোকায় খাওয়া আধা সেরা বেগুন ও তিন পোয়া ফালা আলু কিনে মাছ হাটির দিকে এগিয়ে যায়। মাছের বাজারের শেষের দিকে আলোবিহীন একজন মধ্যবয়সী মাছ ব্যবসায়ীর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে মাছের দরদাম করতে থাকে। মাছওয়ালা বড়ো পাকুড় গাছের নিচে কাঠের তক্তার উপর পলিথিন বিছিয়ে মাছ বিক্রি করছে।

– পুঁটির দাম কতো?

–কত আর? অল্প দাম। দুই ভাগা আছে। নেও তো।

–তাও কতো?

–দশ ট্যাকা।

–পেট তো পঁচে গন্দ বাড়ে গ্যাছে। বাড়িত নিয়ে গেলে বানেছার মাও তো কুটপের চাবা নয়। দশ ট্যাকা! নাহ! পাঁচ ট্যাকা হলে দেও।

–নাহ, দিবের পাবা নোম। কেনা নাই। বেশি দামে কেনা। লাভ নাই। আসল ট্যাকাই উঠপে নয়।

–তাহলে, কত?

– আচ্চা, তোমার জন্যে আট ট্যাকা। শ্যাষ দাম। ব্যাগ পাতাও।

–নাহ, ট্যাকা নাই অতগুলে। সাড়ে পাঁচ ট্যাকা নেও।

–নাহ, পাবা নোম। লস হবি মোর।

–আচ্চা, ঠিক আছে। এই নেও, পাঁচ ট্যাকা বারো আনা। আর কতা কন না। মোর কাছে আর ট্যাকা নাই।

মাছওয়ালা চুপ করে বসে থাকে। তার বয়স খুব বেশি নয়। পরনে বিড়ির আগুনে পুড়ে যাওয়া ছেঁড়া, ফুটো শার্ট। হাঁটুর খানিকটা উপরে সাদা থান কাপড়ের লুঙ্গি। আরেকটু উপরে উঠলে লজ্জা নিবারণ করা দায় হয়ে উঠবে। বাম হাতে বিঁড়ির অর্ধপোড়া অংশটি কালো কুচকুচে ঠোঁটে রেখে একটা সুখ টান দেয়। এরপর মুখ ও নাক দিয়ে সাদাধোঁয়া ছেড়ে দেয়। ধোঁয়া লেগে চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে যায়। বিড়ির বাকি অংশটা আলগাভাবে ঠোঁটে লেগে থাকে। এরপর, মাছ তুলতে গিয়েও তোলে না। হালকা পানির ঝাপটা মাছের উপর ছড়িয়ে দিয়ে বাজির দিকে তাকিয়ে থাকে। যদি বাজি মাছের দাম আরেকটু বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু, বাজি সেদিকে খেয়াল না করে খরচের ব্যাগটা দুই পায়ের মাঝখানে চাপ দিয়ে ধরে রাখে। যেন উল্টে পড়ে না যায়। এরপর, একটা সবুজ রঙের পলিথিনের ব্যাগের মুখ খুলে দুই হাত দিয়ে ধরে বলতে থাকে– ‘এটার মদ্দে দ্যাও।’ মাছওয়ালা এবার বলতে থাকে– ‘লস হলো। হোক কি আর করার। আত হয়া গ্যাছে। বাড়িত যাওয়া নাগবি। নেও বাজি। আজ নাহয় লস হলো।’

আনছার বাজি মাছ হাটি থেকে সোজা কলা হাটিতে গিয়ে এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা দিয়ে মোটা ও বড়ো দুটি বিচিওয়ালা কলা কিনে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয়। পথিমধ্যে মনে হয় সালেহার মাও তাকে গ্যাসের ট্যাবলেট আনতে দিয়েছে। ফলে বাজি আবার ঔষধের দোকানে যায় এবং ঔষধ চায়। দোকানদার জিজ্ঞেস করে কী ঔষধ? বাজি বলতে পারে না। তখন ঔষধ বিক্রেতা আবার বলে কোন কিছুতে লিখে দিছে। বাজি কোন উত্তর দেয় না। অবশ্য একটু পর তার তালি দেওয়া শার্টের পকেট‌ থেকে ঔষধবিহীন পাতা বের করে দেয়। এবার বিক্রেতা তাকে জিজ্ঞেস করে– ‘কয়টা? এক পাতা।’ ঔষধের টাকা দিয়ে আনছার বাজি সিজুর মনোহারি দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। একটু পর ব্যাগের ভেতরে থেকে একটা পুরাতন কাঁচের শিশি বের করে দোকানদারকে দেয় দুই টাকার সরিষার তেল দেবার জন্য। সিজু দোকানি জিজ্ঞেস করে আর কিছু লাগবে বাজি?

–নাহ!

–বিড়ি নাগবে নয়?

– না, আছে।

– আচ্ছা ঠিক আছে। একটা খাও এমনি। বসো।

–মাছ নিচোম বাহে, তাড়াতাড়ি যাওয়া নাগবি।

–কী মাছ নিচেন, পুঁটি?

–হু।

–তাহলে, তাড়াতাড়ি যাও। মাছের প্যাট বোধহয় পঁচে গেল।

–তা, বাজি, একটা কথা। মোর অ্যানা বাড়ি দিয়ে যাওয়া নাগবি। মুইয়ো মাছ নিচোম। কিন্তু যাবার পাম নাই। খালি সাদেকের মায়োক কন য্যান ভাজি করে আন্দে।

–দেও।

– এই বিড়ি চারটে নেও। ট্যাকা নাগবে নয়। যাও তাড়াতাড়ি যাও। আর কোনোঠেন আটকেন না।

–আচ্চা।

এবার আনছার বাজি বাজার থেকে ব্রিজ পার হয়ে বাড়ির দিকে রওনা হয়। আনছার বাজি যখন বাড়ির পথে রওনা হয় তখন রাস্তায় আর কোন হাটফেরত মানুষ থাকে না। শুনশান পরিবেশ বিরাজ করে চারদিকে। যারা ব্যবসায়ী তারা হিসেবের খাতা ঠিক করে ও দোকান ঝাড়ু দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। অবশ্য এর মধ্যেই অনেকেই দোকানের ঝাঁপি নামিয়ে ফেলছে আবার কেউ বাতি বন্ধ করে দোকানঘর তালাবন্ধ করছে। কেউ কেউ চটের বস্তা ও ডালি সাইকেলে বেঁধে ইতোমধ্যে রওনা দিয়েছে। আনছার বাজি দ্রুত গতিতে পা চালাতে থাকে। কেউ কেউ তাকে দোকানঘর ঝাড়ু  দিতে দিতেই বলে– ‘বাজি, আর অ্যানা পর একসাথেই যাই, থাকো।’ বাজি সহজ উত্তরে বলে–  ‘নাহ, আত হয়ে গ্যাছে মেলা। আর থামা যাবা নয়।’ অনেক দোকানিই এমনি করে তাকে ডাকে। কিন্তু বাজি আর থামে না। সবাই অবশ্য  জানে বাজি কারো সাথে যাবে না। ফলে, তারা বাজিকে আটকায় না। আনছার বাজি দ্রুত গতিতে পা চালিয়ে বাবুর তেকানি পার হয়ে সিজুর বউকে মাছের ব্যাগ দিয়ে আসে। এরপর বেদের বাড়ি পার হয়ে সাগরের বাড়ির কাছাকাছি যেতেই মাথার উপর দিয়ে কতগুলো বাদুড় উড়ে গিয়ে এক বটগাছ থেকে আরেক বটগাছের ছোট ডালে মাথা নিচের দিকে দিয়ে পা উপরে দিয়ে ছোট ডাল ধরে ডানা মেলে ঝুলতে থাকে। সেইসাথে একধরনের রহস্যজনক আওয়াজ করতে থাকে। একটা ইঁদুর রাস্তার একপাশে থেকে আরেক পাশে যাবার সময় বাজির পায়ের উপর দিয়ে দ্রুত গতিতে দৌড়ে পালায়। মুহূর্তের মধ্যে বাজির শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। বুক কেঁপে ওঠে। হাত পা অবশের মতো লাগে। বাজি বুকে থুতু ছিটিয়ে দেয়। জ্যোৎস্না রাতে শরীরের ছায়া স্পষ্ট বোঝা যায় বলে আনছার বাজির ছায়া আগে আগে দৌড়াতে থাকে। রাস্তার দু'পাশে তেমন একটা বাড়ি-ঘর নেই বলে বাতাসে গাছের পাতায় কাঁপন ছাড়া আর কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। মাঝেমধ্যে হাটফেরত একজন দুজন লোক সাইকেলে সওদা নিয়ে বাসায় ফিরে যাচ্ছিল। আনছার বাজির এ রাস্তায় মোটামুটি সবাই পরিচিত। দীর্ঘদিন এ রাস্তায় যাতায়াত বলে সবাই তাকে চেনে। বেটে-খাঁটো চেহারার মানুষ আনছার বাজি। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে চেপ্টা করলে যেরকম হয় ঠিক সেরকম দেহের গড়ন তার। চোখ দুটো কিছুক্ষণ পরপর পিটপিট করে। তামাটে বর্ণের গায়ের রং জ্যোৎস্নার আলোতে কালো দেখায় তাকে। দাঁড়িতে-গোঁফে-চুলে অনুসন্ধান করেও একটাও কাঁচা চুল পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আনছার বাজি ছোটবেলা থেকেই এ রাস্তায় চলাচল করে অভ্যস্ত। বিশেষ করে বাজির বাপ যখন বেঁচে ছিলেন তখন থেকেই তাঁর সাথে বাজি বাজারে যেতো। বাজির বাপ দুলা শেখ বাজার থেকে রাত করে ফিরতেন।‌ ছোট বেলায় বাজি বাপের সাথে বাজারে ঘুড়ে বেড়াতো। বলা যায় বাপের কাছ থেকেই দেরিতে বাজার থেকে ফেরার অভ্যাস বাজি পেয়েছে।

আনছার বাজি এ রাস্তায় অনেক আসা-যাওয়া করছে। রাত-বিরাত তার কখনোই কোন কিছু মনে হয়নি। কত জায়গা থেকে হাট করে বাড়িতে এসেছে তার ঠিক নেই। যদিও অনেকের কাছেই নানা কথা শুনেছে কিন্তু কখনোই সে চোখে কিছু দেখে নি। কিন্তু আজ কেন যেন মনের মধ্যে তার ভয় ভয় করছে। পা দ্রুত চালাতে পারছে না। মনে হচ্ছে পা ও শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। এ অবস্থায় বাজি ছকু ডাইরেক্টরের বাড়ির সামনে আসতেই একটা শিয়াল মুখে হাঁস কিংবা মুরগি নিয়ে দৌড়ে পুকুর পাড়ের দিকে চলে যায়। বাজি সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। এরপর সামনে তাকিয়ে দেখে একটা বড়ো অজগর সাপ রাস্তার মাঝখানে পুব-পশ্চিম হয়ে শুয়ে আছে। কোন নড়াচড়া নেই। বাজি ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। তার শরীর কাঁপতে থাকে। বুক ধরফর করতে থাকে। ব্যাগটা পাশে রেখে বাজি একটা বিড়ি ধরায়। বিড়ি ধরাতেও তার ভয় লাগে। কারণ,  পাশেই কবর। অনেক পুরাতন জোড়া কবর। আনছার বাজি দশ-পনের মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। কিন্তু সাপের নড়াচড়া না দেখে রাস্তা পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাস্তা থেকে মিঠু ভাইয়ের নাম ধরে ডাকে। মিঠু ভাই, বিছানা থেকে লাইটসহ উঠে আসে। বাজি তাকে সাপের কথা বলে। মিঠু ভাই লাইটের আলো জ্বালিয়ে কিছুই দেখতে পায় না। অবশেষে,  বাজিকে বলে– ‘কোন কিচ্ছুই তো নাই বাজি। হাটো, তোমাক মুই আগে দিয়ে আসোম।’ বাজি বুঝতে পারে তার কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু মিঠু ভাইকে বুঝতে দেয় না। বাড়িতে গিয়ে বানেছার মাকে ডেকে তোলে। খরচের ব্যাগটা হাতে দিয়ে বাজি টিউবওয়েল থেকে হাতমুখ ধুয়ে আসে। তার স্ত্রী শুধু বলে– ‘এতো আত হলো ক্যা গো। অ্যাখোন অ্যানা আগে আসপের পান না। বুড়া হয়া গ্যালা। তাও আত করে আসেন। এতো আতোত পুঁটি মাছ। কখোন কুটিম, কখন আন্দিম।’ বাজি কিছু বলে না। কোন উত্তর দেয় না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তার স্ত্রীর দিকে চেয়ে থাকে। বানেছার মা’ও  তার স্বামীর দিকে চেয়ে থাকে। বানেছার মা এর আগে কোনদিন বাজিকে এমন দেখে নি।  ভয়ার্ত ও জড়োসড়ো দেখায় তাকে। বানেছার মা কিছু আর বলে না। শুধু বলে, তুমি ঘরোত যায়া শোতো, মুই মাছ আন্দে আসতিছোম।

বাজি ক্লান্ত ও ভয়ার্ত শরীর নিয়ে ঘরে শোয়। তার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। হাত পায়ের মধ্যে কামড়াকামড়ি করতে থাকে। শরীর চাবাতে থাকে। একসময় শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। শরীর কাঁপতে থাকে। বানেছার মা এসে তাকে ডাকে। কিন্তু বাজি কোন উত্তর দেয় না। শুধু গোঙাতে থাকে। তার স্ত্রী বলে,  ‘ ওগো, ওঠো আন্দোন হচে।’ কিন্তু বাজি হ্যাঁ হু কিছুই বলে না। এবার বানেছার মা তার গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে গিয়ে চমকে ওঠে। তার হাত গরমে পুড়ে যেতে থাকে। অ্যাতো জ্বর এর আগে তার আসে নাই। তার স্ত্রী বাজির শরীরে মোটা কাঁথা দিয়ে দেয়। মাথায় পানি ঢালতে থাকে। সাতদিন পর্যন্ত বাজি কিছু বলতে পারে না। সাতদিনের জ্বরে তার শরীর ক্ষীণ হয়ে এসেছে। এখন একটু একটু করে খেতে পারে কিন্তু হাঁটতে পারে না। কানের মধ্যে শব্দ হয়। এখনো মাথা ঘোরে। আর সেদিন হাট থেকে ফেরার পথে কী হয়েছিল বাজি তার কিছুই মনে করতে পারে না।

ট্যাগসমূহ

magnifiercrossmenu