শেখ শরীফ
শেখ শরীফ, অ্যাকাডেমিক নাম মো. শরিফুল ইসলাম। পেশায় শিক্ষক, নেশায় পাঠক ও লেখক। তাঁর কাছে জীবন মানে শেখা এবং প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখা। সাহিত্য তাঁর আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, আর একাকিত্ব তাঁর ভাবনার ক্ষেত্র। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ওমর আলীর কবিতা এবং একাকিত্বের শিল্প (২০২৩)।
শেখ শরীফ

গোলকধাঁধা

বার পড়া হয়েছে
শেয়ার :

এক.

স্বপ্নীলের ঘুম ভাঙলে সে দেখতে পায় তার সমস্ত শরীর ঘামে ভেজা। মুখ দিয়ে লালা পড়ে বালিশ ভিজে গেছে। বিছানা জড়োসড়ো। হাতে-পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। চোখে-মুখে ভয়ের স্পষ্ট চিহ্ন। মাথা ঝিমঝিম করছে। তখনো ভোরের সূর্য ওঠেনি বলে কাউকে সে ডাকতে পারে না‌। বিছানা থেকে উঠে ভয়ে সে মেঝেতে পা রাখতেও পারে না। কিছুক্ষণ আগে তার সাথে যা হয়েছে তা মনে পড়তেই ভয়ে গা শিউরে উঠছে। আসলে যে রাস্তা দিয়ে সে হেঁটে যাচ্ছিল তার পাশে ছিল ছোট ছোট ঝোপঝাড়। মাঝেমধ্যেই একটি-দুটি করে বড় মেহগনি আর দেবদারু দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু একটানা কোথাও গাছের সারি বা জঙ্গল কিংবা বাঁশঝাড় ছিল না। তবে যে গাছগুলো ছিল সেগুলোর পাতার ফাঁকে ফাঁকে অসংখ্য বাদুড় ঝুলে ছিল। আর ছোট ঝোপঝাড় থেকে একটি-দুটি করে বেজি এবং গুঁইসাপ রাস্তার একপাশ থেকে অপর পাশে দৌড়ে কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছিল। স্বপ্নীলের একটু একটু ভয় করতে থাকে। আসলে ভুলে কোন রাস্তায় প্রবেশ করেছে তা সে বুঝতে পারে না। তবে সে অনুমান করেছিল, এ রাস্তার পরে নিশ্চয় কোনো নতুন রাস্তা বের হবে। ফলে, সে এগিয়ে যেতে থাকে। যতই সে এগিয়ে যেতে থাকে ততই নতুন নতুন রাস্তা তার সামনে বের হতে থাকে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কোনো রাস্তাই সে চেনে না। সে যে পিছনে ফিরবে তাও পারে না। কারণ, পিছনে ফিরে সে দেখতে পায়, যে রাস্তায় সে এসেছে, সেই রাস্তার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। বরং রাস্তার পরিবর্তে সে ঘন জঙ্গল আর জঙ্গলের পিছনে উঁচু উঁচু পাহাড় দেখতে পায়। স্বপ্নীলের এবার সত্যিই ভয় লাগে। সে বুঝতে পারে না, তার সাথে আসলে কী হচ্ছে। কেন সবকিছু চোখের পলকে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে? তার মাথায় জটিল ভাবনা দানা বাঁধতে থাকে। হাত-পা ঘামতে থাকে। নিঃশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকে। বুক ধড়ফড় করতে থাকে। এমন সময়ে সে দেখতে পায় একটি সুন্দর ঝকঝকে তকতকে রাস্তা। যে রাস্তার দুই পাশে কোনো বাড়ি নেই, কোনো মানুষ নেই। তবে মাঝে মাঝে রাস্তায় একটি-দুটি করে তালগাছ বোবার মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে তালগাছে বাবুই কিংবা চড়ুই পাখির বাসা নেই। এমনকি অন্য কোন পাখির কিচিরমিচির শব্দও নেই।  এমনিভাবে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই সে দেখতে পায় স্বচ্ছ জলাশয়। যে জলাশয়ে সাদা সাদা হাঁস মনের আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছে। এবার স্বপ্নীলের মনে কিছুটা আশা জাগে। সে ভাবে নিশ্চয়ই কোন মানুষের সাথে তার দেখা হবে। সেই আশায় স্বপ্নীল পথ চলতে থাকে। তার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর লাগে, যে পথ অতিক্রম করে সে এসেছে, পিছনে ফিরে তাকাতেই সেই রাস্তা চোখের পলকে কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছে। আসলে রাস্তা কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নীল তার হদিস খুঁজে পায় না। স্বপ্নীল কোন জগতে এসেছে তাও বুঝতে পারে না। সে বুঝতে পারে না, এখন সে কোথায় আছে। তার সাথে থাকা মুঠোফোনে কোনো নাম্বার ভেসে উঠছে না। তার মুঠোফোনে কোনো নেটওয়ার্ক কাজ করছে না। তার কাছে সবকিছুই অত্যাশ্চর্য বলে মনে হতে থাকে। যেহেতু কারো সাথে সে যোগাযোগ করতে পারে না, সেহেতু সে সামনে যাওয়াটাই শ্রেয় মনে করে। এরপর যখন সে আরো সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তখন সে দেখতে পায় এক ধরনের বুনোহাঁস মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সে কিছুটা আশা খুঁজে পায়। একটু পর দেখতে পায় একজোড়া সাদা কবুতর পথের ধারে ঠোঁট দিয়ে পালক ঘষছে। সেইসাথে, একটি অপরটির গলায় ঠোঁট বুলাচ্ছে। আরো কিছুদূর যেতেই দেখতে পায় দুটো হরিণ পথের ধারে চরে বেড়াচ্ছে। এবার স্বপ্নীলের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, সে  নিশ্চয়ই এবার রাস্তা খুঁজে পাবে। কিন্তু পরক্ষণেই তার সেই আশা গুড়ো বালিতে রূপ নেয়‌। বিশেষত, যখন সে দেখতে পায় একটা বুনোহাঁস, একটি বড় অজগরকে গিলে খাচ্ছে। আর সেই অজগর আবার বুনোহাঁসের সামনেই উড়ে আসছে। একই ঘটনা যখন অজগর আর বুনোহাঁসের মধ্যে ঘটতে থাকে, তখন স্বপ্নীলের বুক দুরুদুরু করতে থাকে। কোন আজব রাস্তায় সে এসেছে বুঝতে পারে না। তার কেবলই মনে হতে থাকে কেন মিলন, নবীন আর আলেক তার সাথে নেই। ওরা কোথায় আছে? সে তো ওদের ছাড়া কোথাও যায় না। একসাথেই ওরা ঘুড়ে বেড়ায়। ওরা থাকলে নিশ্চয় এমনটা হতো না। এমনি নানা ভাবনার জগতে সে হারিয়ে যেতে থাকে।‌ কিন্তু, বেশিক্ষণ সে এসব নিয়ে ভাবতে পারে না। তার মাথা কাজ করে না। সে এই গোলক ধাঁধা থেকে বের হতে চায় কিন্তু পারে না।

দুই.

এমনিভাবে আরো কিছুদূর এগিয়ে যেতেই সে দূরে একটা প্রাসাদ দেখতে পায়। আসলে প্রাসাদটি তার কাছাকাছি মনে হলেও সেটি কাছে ছিল না। দূর থেকেও প্রাসাদটির ঔজ্জ্বল্যের কারণে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। প্রাসাদটির কারুকার্য ছিল চোখে পড়ার মতো। দেয়ালে দেয়ালে চাঁদ-তারা ছাড়াও বিভিন্ন লতা-পাতা ও কারুশিল্পের নিখুঁত কাজ ছিল। স্বপ্নীল চিত্রশিল্পীর আঁকা এমন ছবি আগে কখনো দেখেনি। প্রাসাদটিকে কাছ থেকে দেখার জন্য তার মনে আগ্রহ জন্মায়। সে দ্রুত হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে তার পা নিস্তেজ হয়ে আসে। তার পিপাসা লাগে। চারদিকে পানি খোঁজ করেও সে কোথাও পানি পায় না। চোখে তার আলো কমে আসতে থাকে। চোখে শুধু সে অন্ধকার দেখতে পায়। এমন সময় সে দেখতে পায় একটি বড় স্বচ্ছ পুকুর। সেই পুকুরের পানি এতটাই সাদা যে,  মনে হয় সম্পূর্ণ পুকুর জুড়ে রয়েছে পানির পরিবর্তে দুধ। স্বপ্নীল পুকুরের কাছাকাছি গিয়েও পানি পান করতে পারে না। আঁজলা ভর্তি পানির মধ্যে সে দেখতে পায় ছোট ছোট সাদা পোকা। আসলে তার হাতে পানির পরিবর্তে উঠে আসে আঁজলা ভর্তি সাদা সাদা পোকা। ভয়ে তাড়াতাড়ি সে পোকাভর্তি হাত ঝাড়তে থাকে। তার হাতের উল্টো দিকে একটা সাদা মোটা পোকা আটকে থাকে। অনেক ঝাড়াঝাড়ি করার পরেও সে পোকাটাকে ফেলে দিতে সমর্থ হয় না। অবশেষে, সে আচমকা জোরে একটা  ঝাড়া মারতেই পোকাটা মাটিতে পড়ে যায়। এরকম পোকা সে জন্মাবধি কোনো দিন দেখেনি। তার গা ঘিনঘিন করতে থাকে। পেট মোচড়াতে থাকে। মুখ ভরে বমি আসতে চায়। ফলে, পানি পান করার কথা সে ভুলে যায়।

স্বপ্নীল মনের দিক থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। সে নিজেকে বুঝাতে থাকে যেভাবেই হোক তাকে এই গোলক ধাঁধা থেকে বের হয়ে আসতেই হবে। ফলে, সে আবার হাঁটা শুরু করে। এবার সে কোন ভুল রাস্তায় কিংবা  ভুল পথে পা দিবে না। সে প্রতিজ্ঞা করে কোন কিছু সে পান করবে না, বা কোন কিছু খাবে না। কারণ, সে পানি পান করার আগে লাল টকটকে আপেল দেখে গাছ থেকে ছিঁড়ে মুখে দেওয়ার আগেই হাতে দেখতে পেয়েছিল তাজা রক্ত। আপেলের পরিবর্তে তার হাতে ছিল রক্তের দলা। এরপর, পাকা আঙুর দেখে স্পর্শ করতেই নখে হুল ফুটিয়েছিল মৌমাছি। ফলে, সে আর কোনো ধোঁকায় পড়তে চায় না। সে বুঝতে পেরেছে সে এক ভয়ানক গোলকধাঁধায় পড়েছে। তাই, সে চিন্তা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু, তার সে চিন্তা কোনো কাজে আসে না, যখন সে  সামনে একটা প্রাসাদ দেখতে পায়। সে প্রাসাদের সামনে পাথরের দুটি বড় বড় মূর্তি দেখতে পেয়ে চমকে ওঠে। চমকে ওঠার কারণ এক চোখওয়ালা মূর্তি।  আর সেই চোখটি তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মূর্তিটির পায়ের কাছে লেখা–‘আমার চোখের ভাষা পড়ে নাও, ভবিষ্যতকে জেনে নাও।’ স্বপ্নীল কৌতূহলী হয়ে মূর্তির চোখের দিকে তাকিয়ে সামনে আরো কী কী ঘটতে পারে তার একটা ফিরিস্তি পেয়ে যায়। এতক্ষণ, যা কিছুই তার সাথে ঘটেছে তা নাকি সব কিছুই ঠিক। সেইসাথে, এখন যেটা তার সাথে ঘটতে যাচ্ছে সেটা নাকি আরো ভয়ংকর। এমনকি, এখন তার সাথে যেটা ঘটতে যাচ্ছে, সেটাতে তার বড় বিপদ হতে পারে। এটা পড়ার পর স্বপ্নীলের শরীর শক্ত হয়ে যায়, সেও পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে না আসলে তার কী করা দরকার। ফলে সে তালকানার মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

এর অল্পক্ষণের মধ্যেই, স্বপ্নীল দেখতে পারে একচোখওয়ালা মূর্তির ভেতর থেকে একটা বড় অজগর লিকলিকে জিহ্বা বের করে মাথা উঁচু করে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এমন দৃশ্য দেখার পর স্বপ্নীল বুঝতে পারে না, সে কী করবে? একসময় সে বাধ্য হয় ছুটে পালাতে। তার আর প্রাসাদের মধ্যে প্রবেশ করা হয়ে ওঠে না। সে এক নিঃশ্বাসে দৌড়াতে থাকে, দৌড়াতেই থাকে। আশেপাশে কোথাও তাকানোর ফুরসৎ পায় না। একসময় স্বপ্নীলের দৌড়ানোর গতি কমে আসে। তার গতি ধীর থেকে ধীর হতে থাকে। স্বপ্নীল একসময় বুঝতে পারে তাকে অনুসরণ করে পিছনে পিছনে অজগরও এঁকেবেঁকে ছুঁটছে। স্বপ্নীল দৌড়াতে দৌড়াতে যেখানে এসে থেমেছিল, তার সামনে একটা উঁচু পাহাড়ের মতো দেখতে পায়। আসলে সেটি পাহাড় ছিল না,  ছিল একটি উঁচু টিলা। সে ভয়ে  টিলার ওপরে ওঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। তার হাত-পা ছিলে যায়, বুক চিঁড়ে যায়। ঘনঘন নিশ্বাস পড়তে থাকে। সে ভেবেছিল অজগরটি চলে গেছে। ফলে সে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেয়। কিন্তু চোখ খুলে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখতে পায় অজগরটি ফণা তুলে হা করে জিহ্বা বের করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এবং সাপটির মুখের মধ্যে আরো অসংখ্য ছোট ছোট বাচ্চা অজগর কিলবিল করছে। এবার সে কষ্ট করে টিলার উঁচুতে ওঠার জন্য চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু সে উঠতে পারে না। অনেক কষ্টের পর সে টিলার ওপরে উঠে বসে। নিস্তেজ দেহ আর বলহীন শরীর নিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় হাজার হাজার ছোট-বড় বিষাক্ত সাপ জিহ্বা বের করে টিলা বেয়ে উপড়ে উঠে আসছে। স্বপ্নীল আর কিছু ভাবতে পারে না। সে চোখ বন্ধ করে। তার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে থাকে। তার কথা বলার শক্তি হারিয়ে যায়। কাউকে চিৎকার করে ডাকতে গিয়েও ডাকতে পারে না। সে স্রষ্টার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সঁপে দিয়ে গোলকধাঁধা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য জোরে চিৎকার করে ওঠে। অবশেষে, সে নিজেকে তার বিছানায় ঘর্মাক্ত ও ক্লান্ত অবস্থায় আবিষ্কার করে।

ট্যাগসমূহ

magnifiercrossmenu